হাসবিদ্যকথা বিদ্যাপতি বড়ো প্রশ্ন উত্তর :
হাসবিদ্যকথা বিদ্যাপতি বড়ো প্রশ্ন উত্তর
প্রশ্নোত্তর
রচনাধর্মী প্রশ্ন (প্রশ্নমান-৫)
প্রশ্নঃ হাসবিদ্যকথা গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার কর। বা, ‘হাসবিদ্যকথা’ গল্পটির নামকরণের সার্থকতা নিরূপণ কর।
উঃ হাসবিদ্য বলতে নর্মসচিব বা বিদূষককে বোঝায়। এরা বৃদ্ধিকুশলতা গুণে বিচিত্র অঙ্গ-ভঙ্গি ও বাগ্বিন্যাসের দ্বারা সকলের হাস্য উৎপাদন করে আনন্দদান করে। অতীব দুঃখী বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত লোকও এঁদের কৌশলে মনস্তাপ ও দুশ্চিন্তা বিস্মৃত হয়ে বিমল আনন্দ উপভোগ করে-এভাবে এদের সান্নিধ্যে এসে মানুষের জীবন আনন্দময় ও দীর্ঘায় হয়ে থাকে।
আলোচ্য ‘হাসবিদ্যকথা’ গল্পে চতুর্থ চোর মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার উপায়রূপে বেছে নিয়েছে। এ জগতে সকলেই কোন না কোন উপায়ে চৌর্যবৃত্তি করে থাকে কি উচ্চবিত্ত কি নিম্নবিত্ত। আর তা যদি হয় তবে কথিত চোরের একা কেন শাস্তি হবে। একথা রাজামশাইকে বলতে রাজামশাই ভেবে দেখলেন সত্যিই তো আমরা সবাই চোর তবে একা ওর প্রাণনাশ হবে কেন? রাজার রাগ করা তো দূরের কথা তিনি হেসে ওর বুদ্ধির তারিফ করে বললেন যে, ‘ও আমার কাছে থাক আর আমাকে হাসাক। আর ওর নির্মম সত্য কথাটা অকপটে বলার জন্য ওকে পুরস্কৃত করা হোক।’
এখানে গল্পচ্ছলে লেখক হাস্যরসিকের কাহিনী নিখুঁতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন বলে নামকরণ ‘হাসবিদ্যকথা’ যথার্থই সার্থক হয়েছে।
প্রশ্ন: কেন স্বর্ণবীজ বপন করতে কেহ রাজী হ’ল না?
উঃ চোরটি যখন স্বর্ণকৃষির বীজ ও ক্ষেত্র তৈরী করে রাজাকে কোন বীজবপনকারী দেওয়ার জন্য অনুরোধ করল (যেহেতু চোরের বীজ বপনের কোন অধিকার নেই) এবং স্বয়ং রাজাই বীজ বপন করুন না কেন বললে, রাজা বললেন যে তিনি চারণদের দেবার জন্য তার পূজনীয় পিতৃদেবের টাকা চুরি করেছিলেন। চোর বলল- তাহলে মন্ত্রীদের কেহ বপন করুন। এতে মন্ত্রীরা বললেন তারা রাজকর্মচারী হয়ে চোর না হয়ে কি করে থাকতে পারেন? এরপর চোর প্রধান বিচারপতিকে বপনের জন্য অনুরোধ করলে তিনি স্বীকার করলেন যে শৈশবে মায়ের মিঠাই চুরি করেছিলেন- এভাবে দেখা গেল সকলেই কোন না কোন ভাবে চৌর্য বৃত্তির সঙ্গে জড়িত থাকায় কেহই স্বর্ণবীজ বপনে স্বীকৃত হ’ল না।
প্রশ্নঃ ‘হাসবিদ্যকথা’ গল্পে উল্লিখিত চতুর্থ চোরের ধূর্ততার পরিচয় দাও।
উঃ একে একে তিনটি চোরকে শূলে চড়াতে দেখে চতুর্থ চোর মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য একটি উপায় উদ্ভাবন করল। সে রাজাকে স্বর্ণ কৃষি জানে বলে খবর পাঠালে রাজা স্বর্ণকৃষির নিয়ম জেনে তাকে রাজপ্রাসাদের এক কোণে যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিলেন।
চোর যথারীতি সোনার বীজ ও ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রাজাকে একজন বীজবপনকারী দিতে বলল, যেহেতু চোরের বীজবপনের অধিকার নেই। চোর রাজাকে এবং একে একে মন্ত্রী, ধর্মাধিকারী সকলকে বীজবপনের জন্য আহবান জানাল – কিন্তু দেখা গেল সকালেই কোন না কোন সময়ে চৌর্যবৃত্তি অবলম্বন করেছেন। তখন চোরটি বলল মহারাজ দেখা গেল আপনারা সকলেই চোর-তবে কেন আমার একার প্রাণদণ্ড হবে। এতে রাজামশাই চোরের বুদ্ধির কুশলতা দেখে হেসে ফেললেন। রাজার রাগ চলে গেল এবং তিনি তাকে পুরস্কৃত করে বিদূষক হিসেবে তার কাছে থাকার আদেশ দিলেন। এভাবে চতুর্থ চোর ধূর্ততাবশতঃ নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
প্রশ্ন: হাসবিদাকথা-র কাহিনী লেখ এবং সংস্কৃতে নীতি লেখ।
উঃ সুপ্রতাপ নামে রাজা যখন কাঞ্চী নগরীতে রাজত্ব করছিলেন, তখন এক সময়ে এক ধনীর গৃহে চুরি করার কালে চারজন চোর ধরা পড়ে। রাজা তখনকার আইন অনুসারে তাদেরকে শূলে চড়িয়ে বর করতে ঘাতকদের আদেশ দেন। একে একে তিনজন নিহত হ’ল, যখন চতুর্থ চোরকে শূলে চড়ান হবে তখন সে প্রাণ রক্ষার নিমিত্ত শেষ চেষ্টা করে দেখতে ইচ্ছুক হয়ে ঘাতকদের বলল- “আমার একটি বিশেষ বিদ্যা জানা আছে। তা আমি মরার পূর্বে রাজাকে দিয়ে যেতে ইচ্ছা করি। অনাথা আমার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তা পৃথিবী হতে বিলুপ্ত হবে। অতএব তোমরা গিয়ে রাজাকে একথা জানাও।”
ঘাতকেরা চোরের কথা বিশ্বাস করতে না পেরে তাকে উপহাস করল, কিন্তু চোর তাদের বোঝাল যে, তার এই অমূল্য বিদ্যার কথা রাজাকে তাদের জানান উচিত এবং রাজকার্যে অবহেলা করা উচিত নয়। এই কার্যের জন্য রাজার নিকট হতে তাদের পুরস্কার লাভেরও সম্ভাবনা আছে।
এর পরে ঘাতকেরা রাজাকে এই সংবাদ দিল। তিনিও কৌতূহলাম্বিত হয়ে চোরকে ডেকে, তার বক্তব্য বলতে আদেশ করেন। তখন চোর বলল- “আমি সোনার চাষ জানি। সরিষাপ্রমাণ সোনার বীজ প্রস্তুত করে মাটিতে বপন করতে হয়, একমাস পরে ছোট ছোট চারা গজায়। আমার কথা যদি সত্য না হয়, তা হলে একমাস পরে আমাকে হত্যা করবেন।” তখন রাজা তাকে সোনার চাষ করতে আদেশ দিলে, সে সোনা পুড়িয়ে সরিষাপ্রমাণ বীজ প্রস্তুত করল এবং রাজপ্রাসাদের মধ্যে ক্রীড়া সরোবরের তীরে অতি গুপ্তস্থানে জমি প্রস্তুত করে রাজাকে জানাল যে, বীজ ও ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে, এখন একজন লোক চাই যে সোনার বীজ বপন করবে। রাজা চোরকেই উহা বপন করতে বললে চোর বলল- “যে জীবনে কোনদিন কিছু চুরি করে নি, কেবলমাত্র এরূপ লোক ছাড়া অন্য কারও সোনা বপন করার অধিকার নেই।”
তখন সে রাজাকেই বীজ বপন করতে অনুরোধ করল। কিন্তু রাজা বললেন যে, তিনি একবার চারণদেরকে পুরস্কার দেবার নিমিত্ত তাঁর পিতার ধন চুরি করেছিলেন। তখন একে একে মন্ত্রিগণ ও বিচারককে সোনা বপন করতে বলা হলে, তাঁরা কেহই তা করতে সম্মত হলেন না। সকলেই স্বীকার করলেন যে, তাঁরা প্রত্যেকেই কোন না কোন সময়ে কিছু না কিছু চুরি করেছেন। চোর তখন হাসতে হাসতে বলল যে, “আপনারা সকলেই চোর অথচ একা আমাকে দণ্ডভোগ করতে হবে।” ইহা শুনে সভাস্থ সকলেই হেসে উঠলেন এবং হাসির ফলে রাজারও ক্রোধ অন্তর্হিত হ’ল। তিনি চোরের বৃদ্ধিচাতুর্য এবং পরিহাসকুশলতায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে অভয়দানপূর্বক বিদূষকরূপে নিজের কাছেই রেখে দিলেন।
নীতি: প্রত্যাসন্নেহপি মরণে রক্ষোপায়ো বিধীয়তে।
উপায়ে সফলে রক্ষ্য ভবত্যেব ন সংশয়ঃ।।
প্রশ্নঃ ‘প্রত্যাসন্নেহপি মরণে রক্ষোপায়ো বিধীয়তে।’- কে কোন প্রসঙ্গে এরূপ বলেছিল? সে আরও কি চিন্তা করেছিল?
উত্তর: (ক) কাঞ্চী নগরীর রাজা সুপ্রতাপ শাস্ত্রীদের দ্বারা তাঁর নিকট আনীত চারজন চোরকে দেখে ওদের বধ করার জন্য ঘাতকদের আদেশ করলেন। ঘাতকগণ বধ্য ভূমিতে নিয়ে গিয়ে চারজনের তিনজনকে বধ করলে চতুর্থ চোর নিজের মনে এই মহাজন বাক্যটি চিন্তা করেছিল। এর অর্থ-মৃত্যু আসন্ন হলেও রক্ষার উপায় চিন্তা করা উচিত।
(খ) উক্ত চোর আরও চিন্তা করেছিল যে ব্যাধিপীড়িত এবং রাজদণ্ডে দণ্ডিত মৃত্যুর আদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তিও যদি প্রতীকারের চেষ্টা করে, তবে যমদ্বার হতেও ফিরে আসতে পারে।
প্রশ্ন: ‘যদি মম বচনং ব্যভিচরতি, তদা মাসান্তে মমাপ্যন্তো ভবিষ্যতি’- কে কাকে এই কথা বলেছিল? কি প্রসঙ্গে এই কথা বলা হয়েছিল? বক্তা কি উদ্দেশ্যে এরূপ বলেছিল?
উত্তর: (ক) চতুর্থ চোর রাজাকে এরূপ বলেছিল।
(খ) চতুর্থ চোর নৃপতিকর্তৃক মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা প্রাপ্ত হয়ে আত্মরক্ষার উপায় চিন্তা করে ঘাতকগণকে বলল যে সে একটি বিশেষ বিদ্যা জানে। তার মৃত্যুর পরও যাতে সেই বিদ্যা পৃথিবীতে থেকে যায়, তার উদ্দেশ্যে তাকে রাজার নিকট নিয়ে যাওয়া উচিত। ঘাতকগণ সেরূপ করলে রাজার প্রশ্নের উত্তরে চতুর্থ চোর বলল যে সে সুবর্ণকৃষি জানে। সর্ষপপরিমাণ সুবর্ণবীজ বপন করলে একমাসের মধ্যেই অঙ্কুর উৎপন্ন হবে। তার এই কথা সত্য কিনা জিজ্ঞাসিত হয়ে চোর এই উক্তি করেছিল।
(গ) বক্তা চোরের আসল উদ্দেশ্য হ’ল রাজার দণ্ড হতে মুক্তি লাভ করা। যাতে সে আত্মরক্ষা করতে পারে সেই চেষ্টায়ই চোর উক্তরূপ বলেছিল।
প্রশ্ন: “যূয়ং সর্বেইপি চৌরাঃ। কথমহমেকো মারণীয়োহস্মি।” – কে কাদের এই কথা বলেছিল? বক্তা কি কারণে তাঁদের সকলকেই চোর বলতে পেরেছিল? সে নিজে কি কারণে ‘মারণীয়’ হয়েছিল? বক্তার এই উক্তির পরিণাম কি হ’ল?
উত্তর: (ক) এই কথা চতুর্থ চোর রাজা সুপ্রতাপ, তদীয় মন্ত্রিবর্গ এবং ধর্মাধ্যক্ষকে লক্ষ্য করে বলেছিল।
(খ) বক্তা চোর সুবর্ণবীজ বপনের প্রসঙ্গে বলেছিল যে, যে চোর তার এই বীজ বপনের অধিকার নেই। সুতরাং রাজা স্বয়ং স্বর্ণবীজ বপন করুন। তখন রাজা বললেন যে তিনি শৈশবে চারণদের দান করার নিমিত্ত পিতার ধন চুরি করেছিলেন। ইহার পর মন্ত্রিবর্গকে বীজ বপন করতে বলা হলে তাঁরা বললেন যে তাঁরা রাজার কর্মচারী। সুতরাং তাঁরা কিরূপে চোর না হয়ে পারেন। অতঃপর ধর্মাধ্যক্ষও বললেন যে তিনিও ছোট বেলায় মায়ের মোদক চুরি করেছিলেন। এই সকল কথা শুনে চোর বলল যে আপনারা সকলেই চোর। তা হলে আমি একা মরব কেন?
(গ) চতুর্থ চোর কোন ধনীর গৃহে চুরি করতে গিয়ে অন্য চোরদের সহিত সিঁধের মুখেই শাসকদের হাতে ধরা পড়ে এবং রাজা অন্যদের সঙ্গে তাকে বধ করার জন্য ঘাতকদের আদেশ দেন।
(ঘ) বক্তার এই উক্তি শুনে সভাসদ্গণসহ রাজা স্বয়ং হেসে উঠলেন। হাস্যরসে তাঁর ক্রোধ অপনীত হওয়ায় তিনি চোরকে মুক্তি দানের আদেশ দিলেন এবং ইহার পর তার বৃদ্ধির প্রশংসা করে হাস্যরসিকম্বলে তাকে রাজসভায় নিজের কাছে রেখে দিলেন।
চলবে…